গল্প : চাপা কান্না - Sangbad Protidin | সংবাদ প্রতিদিন

ব্রেকিং নিউজ

মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২০

গল্প : চাপা কান্না


বৃদ্ধাশ্রমঃ আবিদা বিলকিছ সাহারা 
গ্রেজুয়েশন শেষ করে মাটির টানে চলে আসি মা - বাবার কাছে। দেশে আসার পর বন্ধু নাহিদ আমাকে নিয়ে এল এমন একটি জায়গায়। সেখানে গিয়ে নিজের চোখের জল সামলিয়ে রাখতে পারি নি। 
নাহিদকে বলি,বেঁচে থাকতে কখনও আমার দাদা - দাদিকে এমন পরিস্থিতিতে পরতে দিতাম না। কিন্তু দূরভাগ্য জন্মের পর থেকে দাদা-দাদির মুখ দেখার সৌভাগ্য আমার হয় নি। সবার চোখ-মুখে যেন একটি চাপা কান্নার বেদনা।

একে একে সবার জীবন গল্প শোনলাম।একজন  বৃদ্ধা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। আমি ওনার কাছে যেতে কেমন জানি একটি মায়াবী হাসি দিলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম দাদু আপনি এখানে কেন?  আপনার কি কেউ নেই ? কথাটি শুনে চোখের জল ছাড়ছিলেন কিছুই যেন বলতে পারছিলেন না। কেয়ার টেকারকে জিঞ্জেস করে জানতে পারলাম তিনি অনেক আগে বাক্শক্তি হারিয়েছন।শান্তনা দিয়ে বললাম , দাদু তোমার জীবন গল্পটা তাহলে আজ আর শোনা হলো না ।আমি অন্যদিন এসে শুনে যাব।  

আবারো একদিন নাহিদকে নিয়ে সবার সাথে দেখা করতে আসলাম কিন্তু সেই বৃদ্ধা মহিলাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না।কেয়ার টেকার একটি চিঠি হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,  সেই বৃদ্ধা মহিলা মারা যাবার আগে চিঠিটা  আপনাকে দেওয়ার জন্য  বললেন।

মারা যাবার কথা শুনে  এই অচেনা মানুষটির জন্য কেমন জানি খুব কষ্ট হচ্ছিল। বাসায় এসে চিঠিটা পড়তে লাগলাম। চিঠিটার প্রথম লাইনটি ছিল।

"তুমি আমাকে দাদু বলে ডাকছিলে এই শব্দটি শুনে আমার মনটি জুড়িয়ে গেল। জীবনে এই প্রথম কেউ আমায় দাদু বলে ডাকল। খুব ইচ্ছে হয়েছিল তোমাকে আমার জীবন গল্পটি বলার। তুমি বলেছিলে আমার বউ বাচ্চা আছে কি না,আমার একটি মাত্র ছেলে যাকে আমি খোকা বলে ডাকি।বাবা হারা খোকাকে কখনও কোনো কিছুর অভাব বুঝতে দেইনি। আমার শেষ সম্বল ভীটে-মাটি বিক্রি করে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করালাম।  

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে নিজের পছন্দমত বিয়ে করে বড়লোক বাপের মেয়েকে। যে আমাকে কখনও শাশুড়ি বলে মেনে নেয়নি। শেষ পর্যন্ত আমার স্থান হয় এই বৃদ্ধাশ্রমে।জানি না খোকা কেমন আছে, কোথায় আছে, ঠিকানাও জানিনে। তাকে দেখার জন্য আমার মন প্রতিটি মূহুর্তে  চটপট করে। আমাকে যেদিন ওরা বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে আসে তখন খোকার একটি ছবি লুকিয়ে নিয়ে আসি। সবসময় তো আর কাছে পাব না, এই ছবি সাথে থাকলে ভাবব খোকা আমার কাছেই আছে। তুমি আমাকে একটি কাজ করে দিবে ভাই। 

খোকাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে। এই খামের মধ্যে খোকার ছবিটি মোড়ানোআছে,ছবিটি সবাইকে দেখিয়ে দিবে। কেউ না কেউ তো তাকে চিনবে। তখন তুমি আমার কাছে নিয়ে আসবে। শেষ সময়ে খোকার মুখকানা দেখে যেতে চাই।"

চিঠি পড়া শেষ করে আমি তাড়াহুরা করে খামের ভিতর থেকে কাগজের মোড়ানো ছবিটা বের করলাম। যখন ছবিটি দেখতে পেলাম তখন যেন আকাশ ভেঙ্গে আমার মাথার উপর পড়ল। খোকাকে চিনতে আর বাকি রইল না। সে আর কেউ নয়, আমার বাবা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন