‘অবৈধভাবে’ সরানো হচ্ছে সিলেটের সেই ৫০ কোটি টাকার ‘সাদা সোনার স্তুপ’! - Sangbad Protidin | সংবাদ প্রতিদিন

ব্রেকিং নিউজ

সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২০

‘অবৈধভাবে’ সরানো হচ্ছে সিলেটের সেই ৫০ কোটি টাকার ‘সাদা সোনার স্তুপ’!


নিজস্ব প্রতিনিধি:
সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়ায় জব্দ করা ‘সাদা সোনার স্তুপ’ তিন দফা নিলামে উঠলেও রহস্যময় কারণে শেষ পর্যন্ত বিক্রি হয়নি। এক মাসের অধিক সময় ধরে অরক্ষিত পড়ে থাকার পর গত কয়েকদিন থেকে সেই ৫০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের পাথর সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী। এতে বাঁধাও দিচ্ছে না পরিবেশ অধিদপ্তর, বরং দিচ্ছে দায়সারা জবাব।

গত ১৫ ও ১৬ জুলাই পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযান চালায় কানাইঘাটের লোভাছড়া পাথর কোয়ারি ও আশপাশ এলাকায়। এসময় নদীর তীরে মজুদ করে রাখা প্রায় এক কোটি ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়। অভিযানকালে মজুদকৃত পাথরের কোনো মালিক খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানায় পরিবেশ অধিদপ্তর।

জব্দকৃত সেই পাথর নিলামে বিক্রির জন্য দরপত্র আহ্বান করে পরে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। দরপত্র জমার শেষ এবং নিলামের তারিখ নির্ধারণ করা হয় ২১ জুলাই। কিন্তু রহস্যময় কারণে উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ার অজুহাতে ওই পাথরগুলো বিক্রি না করে পুনরায় নিলাম আহবান করা হয়। 

পরে ২৩ জুলাই জব্দকৃত সোনারূপী সেই ১ কোটি ঘনফুট পাথরের বাজারদর অনুযায়ী মূল্য পেতে প্রকাশ্য পদ্ধতিতে পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ে এ নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেদিনও ‘উপযুক্ত দাম’ উঠেনি সেই পাথরের। পরবর্তীতে আরেক দফা নিলাম হলেও বিক্রি হয়নি সেই ‘সাদা সোনার স্তুপ’।

এদিকে, গত ৪ দিন ঘরে ৫০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের সেই পাথর স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী সুরমা নদী দিয়ে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। অথচ পরিবেশ অধিদপ্তর কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না।

পাথর সরানো ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন- উচ্চ আদালতের নির্দেশে তারা পাথর নিয়ে যাচ্ছেন। কারণ- এই পাথরগুলো তাদেরই ক্রয় করা পাথর।

তবে পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে- এভাবে পাথর সরনো অবৈধ।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ এমরান হোসেন আজ সোমবার (২৪ আগস্ট) সিলেটভিউ-কে বলেন, উচ্চআদালতের নির্দেশনা অমান্য করে স্থানীয় কয়েকজন পাথর ব্যবসায়ী পুলিশ প্রশাসনকে একটি ‘উকিলপত্র’  দেখিয়ে পাথরগুলো সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। অথচ পাথর পরিবহনের মালিকানার কাগজপত্র ও ডকুমেন্ট দেয়ার জন্য গত ২০ আগস্ট তাদেরকে চিঠি দেয়া হয়েছে। তারপরও তারা পাথরের মালিকানার কাগজপত্র না দিয়ে আমাদের অনুমতি ছাড়া জব্দকৃত পাথর সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, আমরা শীঘ্রই এ স্থানে অভিযান পরিচালনা করবো।

জানা গেছে, সিলেটের কানাইঘাটের লোভাছড়া পাথর কোয়ারি গত বছর লিজ নেন ব্যবসায়ী ও সিলেট আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা মোস্তাক আহমদ পলাশ। শুষ্ক মৌসুমে তিনি কোয়ারি লিজ নিয়ে পাথর উত্তোলন করে ৪৮ টাকা দরে ব্যবসায়ীদের কাছে পাথরগুলো বিক্রি করে দেন। ওই সময় পাথর পরিবহনের সুযোগ না থাকায় ব্যবসায়ীরা পাথর ক্রয় করে লোভা নদীর দু’পাশে তাদের নিজস্ব এবং সরকারি কিছু জায়গায় পাথরগুলো স্তুপ করে রাখেন। তবে বর্ষার মৌসুম শুরু হতেই ইজারাদার মোস্তাক আহমদ পলাশের লিজের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।

এদিকে, গত জুলাই মাসে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা নদীর দু’পাশে থাকা প্রায় ১ কোটি ঘনফুট পাথর জব্দ করেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের দাবি- মালিক না পাওয়ার কারণে এবং ইজারাদারের লিজের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় পাথরগুলো জব্দ করা হয়।

এরপর পরিবেশ অধিদপ্তরের এই পাথরগুলো বিক্রি করে দিতে নিলাম আহবান করে। এতে সিলেটের মের্সাস ছামী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম জব্দকৃত পাথরের দাম হাকেন ৫০ কোটি টাকা। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেই আরো বেশি দাম পাওয়ার আশায় জব্দকৃত পাথর বিক্রি না করে পুনরায় নিলাম বিজ্ঞপ্তি আহবান করা হয়।

পরপর দুই দফা নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে অংশগ্রহণকারীরা কেউই ৩০ কোটি টাকার ধারে-কাছেও দাম হাকেননি। ফলে পরিবেশ অধিদপ্তর পাথরগুলো বিক্রি করতে পারেনি।

অপরদিকে, লোভাছড়া কোয়ারির পাঁচ ব্যবসায়ী নিজেদের পাথর পরিবহনের অনুমতি চেয়ে উচ্চ আদালতে আলাদা আলাদা রিট পিটিশন দাখিল করেন। এর প্রেক্ষিতে আদালত ৩৯ লাখ ঘনফুট পাথর পরিবহনের অনুমতির আদেশ দেন। এই আদেশ বাস্তবায়ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য খনিজ সম্পদ সচিব, খনিজ সম্পদ ব্যুারোর পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তরের সচিব ও সিলেট পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালকসহ ৮ জন বিবাদিকে নির্দেশ প্রদান করেন।

তবে ব্যবসায়ীদের দাবি- তারা বার বার কর্মকর্তাদের কাছে আদালতের আদেশ নিয়ে ধর্না দিলেও কর্মকর্তারা আদালতের আদেশের পরিবহনযোগ্য পাথরগুলো পরিবহন করার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। এই অবস্থায় গত ২০ আগস্ট হঠাৎ করে রিটকারী ব্যবসায়ীরা লোভা ও সুরমা নদীর দুই তীরে আটকে থাকা পাথর বোঝাই নৌকা ও বলগেটগুলো পরিবহনের জন্য ছেড়ে দেন।

এসময় কানাইঘাট থানা পুলিশ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে পাথর বহনকারী নৌকাগুলো আটকানোর চেষ্টা করে। এসময় ব্যবসায়ীরা তাদের আইনজীবির মাধ্যমে আদালতের আদেশের কাগজগুলো কানাইঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ শামসুদ্দোহা পিপিএমকে প্রদর্শন করেন। এরপর কোনো অ্যাকশনে যায়নি কানাইঘাট থানা পুলিশ নদী থেকে উঠে আসে।

এরপর থেকে মূলত লোভাছড়া পাথর কোয়ারীর পাথরগুলো অরক্ষিত হয়ে যায় এবং এরপর থেকে বিনা বাধায় ব্যবসায়ীরা জব্দ পাথর নৌকা ও বলগেটে বোঝাই করে পাথর সরাতে শুরু করেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন