নবনির্মিত চত্বর নিয়ে মুখোমুখি আওয়ামী লীগ ও মেয়র আরিফ - Sangbad Protidin | সংবাদ প্রতিদিন

ব্রেকিং নিউজ

মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২০

নবনির্মিত চত্বর নিয়ে মুখোমুখি আওয়ামী লীগ ও মেয়র আরিফ


নিজস্ব প্রতিনিধি, সিলেট:
টানা দুই মেয়াদে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী। এই পুরোটা সময়কালেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে আরিফের সাথে আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীদের সখ্যতার বিষয়টি বারবার আলোচিত হয়েছে। তবে এবার সিলেট আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েছেন মেয়র আরিফ।

সিলেট নগরীর সিটি পয়েন্টের নামকরণ নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েছেন সিলেটের সিটি মেয়র। নগরীর বন্দরবাজার এলাকার সিলেট সিটি করপোরেশনের সামনের এই মোড়টিকে কামরান চত্বর হিসেবে নামকরণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। সিলেটের প্রথম মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের নামে এই চত্বর নামকরণের দাবি তুলেছিলেন তারা। গত ১৫ জুন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান সিলেটের দীর্ঘকালীন জনপ্রতিনিধি বদরউদ্দিন কামরান।

তবে রোববার রাতে ওই মোড়ে নির্মিত একটি স্থাপনার উদ্বোধন করতে গিয়ে 'সিটি পয়েন্ট' হিসেবে পরিচিত এই চত্বরকে 'নগর চত্বর' হিসেবে নামকরণ করেন মেয়র।

এ নিয়ে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতাকর্মী মিছিল করে এসে নগর চত্বর লেখা আরিফের নামফলক ঢেকে নবনির্মিত স্থাপনায় 'জনতার কামরান চত্বর' সাইনবোর্ড টানিয়ে দেন। এসময় মেয়র আরিফের প্রতি বিষোদগারও করেন আওয়ামী লীগ নেতারা। 'জনতার কামরান চত্বর' সাইনবোর্ড টানানোর সময় সিটি করপোরেশনের একাধিক কাউন্সিলরও উপস্থিত ছিলেন।

করোনাকালে সারাদেশের মতো সিলেটেও স্থিমিত রয়েছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। তবে 'জনতার কামরান চত্বর'কে ঘিরে সোমবার হঠাৎ উত্তাপ ছড়ায় সিলেটের রাজনীতিতে।  

সোমবার দুপুরের এই ঘটনার পর সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে বিবৃতি দেন বদরউদ্দিন আহমদ কামরান সভাপতি থাকাকালে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা আসাদ উদ্দিন আহমদ। বিবৃতিতে তিনি সিলেটের রাজনৈতিক সম্প্রীতিতে ফাটল ধরানোর জন্য আরিফুল হককে অভিযুক্ত করেন।

বিবৃতিতে আসাদ উদ্দিন বলেন, 'আমরা আশা করেছিলাম সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নিজ থেকেই তার পূর্বসূরি সদ্যপ্রয়াত সিলেটের প্রথম মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্যোগ নেবেন। এ নিয়ে সিটি করপোরেশনের সামনের পয়েন্টকে ‘কামরান চত্বর’ নামকরণের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। সিলেটের সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ জনগণ এমন দাবি উত্থাপন করেন। যা মেয়র সাহেবও অবগত ছিলেন। সেসময় তিনি সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত পরিষদ এবং সিলেটের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছিলেন। কিন্তু গত রোববার রাতে অনেকটা চুপিসারে এই চত্বরকে ‘নগর চত্বর’ নামকরণ করে সেটির উদ্বোধন করেন। যেটি সম্পর্কে সিটি করপোরেশনের বর্তমান নির্বাচিত পরিষদকেও অবগত করেননি। তাড়াহুড়া করে এই চত্বরকে ‘কামরান চত্বর’ নামকরণ না করে ভিন্ননামে উদ্বোধন করে তিনি সিলেটের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রাজনৈতিক সম্প্রীতিতে ফাটল ধরালেন।'

জানা যায়, ১৫ জুলাই বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের মৃত্যুর পর ১৬ জুলাই সিটি পয়েন্টকে 'কামরান চত্বর' নামকরণের দাবি জানান মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন। ১৭ জুলাই ফেসবুকে একটি লাইভ অনুষ্ঠানে এসে মেয়র আরিফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেনের উপস্থিতিতেও এ প্রস্তাব তুলেন জাকির।

এ প্রসঙ্গে সোমবার রাতে অধ্যাপক জাকির হোসেন সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, আমি সেদিন সিটি পয়েন্টকে কামরান চত্বর হিসেবে নামকরণ করার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মেয়র দুজনই সম্মতি জানিয়েছিলেন। এবং এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সিটি মেয়র তার কথা রাখেননি।

জাকির হোসেন বলেন, আজ (মঙ্গলবার) সিটি করপোরেশনের সাধারণ সভা রয়েছে। আমি আশাকরি এই সাভায় কামরান চত্বর হিসেবে নামকরণের সিদ্ধান্ত হবে। যদি তা না হয় তাহলে আমরা জনমত বিবেচনায় পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করবো।

জানা যায়, মঙ্গলবার সিলেট সিটি করপোরেশনের সাধারণ সভা রয়েছে। সভার আলোচ্যসূচিতে এই নামকরণের বিষয়টি না থাকলেও বিষয়টি আলোচনায় উত্তাপনের কথা জানিয়েছেন একাধিক কাউন্সিলর।

সিলেট সিটি করপোরেশনের সামনের চত্বরটি এতদিন সিটি পয়েন্ট নামে পরিচিত ছিলো। রোববার রাতে সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এখানে নির্মিত নতুন স্থাপনার উদ্বোধনকালে পয়েন্টটিকে 'নগর চত্বর' নামকরণ করেন। তবে তার কয়েকঘণ্টা পরই আজ (সোমবার) দুপুরে ওই চত্বরকে 'কামরান চত্বর' নামকরণ করে একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।

সোমবার দুপুরে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল করে এসে ওই চত্বরে কামরান চত্বর লেখা সাইনবোর্ড টানিয়ে দেন। এসময় তারা বিক্ষোভ সমাবেশ করে অবিলম্বে সিটি করপোরেশন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কামরান চত্বর হিসেবে ঘোষণার দাবি জানান।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নগর ভবনের সামনের এই চত্বরকে সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের নামে নামকরণ করার দাবি অনেকদিন ধরেই জানিয়ে আসছেন।  এরপর থেকেই সিটি পয়েন্টকে কামরান চত্বর করার দাবি ওঠে। তবে এমন দাবি আমলে না নিয়ে সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সিটি পয়েন্টকে নগর চত্বর করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।

সোমবার দুপুরে কামরান চত্বর সাইনবোর্ড টানানোকালে উপস্থিত ছিলেন সিটি করপোরেশেনর ২০ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা আজাদুর রহমান আজাদ।

সিটি করপোরেশনের সাধারণ সভায় উত্থাপনের আগেই চত্বরে সাইনবোর্ড বসিয়ে দেওয়া হলো কেন জানতে চাইলে কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, এই মোড়ের নাম 'নগর চত্বর' করার আগেও মেয়র কোনো সাধারণ সভা করেননি। এমনকি আমাদের সাথে কোনো আলাপও করেননি। এছাড়া সব কাউন্সিলরকে বাদ দিয়ে কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়ে এই চত্বরের স্থাপনা উদ্বোধনও করেছেন।

মেয়র আরিফের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে আজাদুর রহমান আজাদ বলেন, তিনি একক সিদ্ধান্তে সবকিছু করেন। আমাদের কোনো মতামত নেন না। তিনি সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত ছাড়াই নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টের নামকরণ করছেন। এমনকি সোবহানিঘাট পয়েন্টকে জামায়াতের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে নামকরণ করছেন। আমরা এটি কিছুতেই হতে দেবো না।

মঙ্গলবারের সাধারণ সভায় কামরান চত্বরের প্রসঙ্গটি উত্থাপন করবেন বলেও জানান আজাদ।

কামরান চত্বর নিয়ে এই বিতর্ক প্রসঙ্গে সোমবার গণমাধ্যমকে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে আমি আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে তাকে শ্রদ্ধা করি এবং আমিও চাই তার স্মৃতি ধরে রাখতে।’

মেয়র আরও বলেন, কামরান চত্বর করার প্রস্তাবটি খুবই সুন্দর। তবে তা এককভাবে সিদ্ধান্ত আমি নিতেও পারি না বা দিতেও পারি না। তাছাড়া মুখে মুখে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াও যায় না। এদিকে সিলেট সিটি করপোরেশনের সামনের এই পয়েন্টকে প্রয়াত বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের নামে নামকরণের জন্য লিখিতভাবে কেউ আমাকে কিছু জানাননি। আমি শুধু বিভিন্ন মানুষের মুখে ও মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছি। তারপরও এটাকেই আমি প্রস্তাব ধরে নিয়ে আমি আমার কার্যক্রমে যাচ্ছি।’

তিনি বলেন, কামরান ছাড়াও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত ইফতেখার হোসেন শামীম, বাংলাদেশের প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও দীর্ঘদিনের সংসদ সদস্য প্রয়াত দেওয়ান ফরিদ গাজী, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিন, আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা ও সাংসদ প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, বীর প্রতীক এনামুল হক চৌধুরী, বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও অর্থনৈতিক সংস্কারক সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের নামে বিভিন্ন স্থাপনা ও চত্বরের নামকরণের জন্যও অনেকে আমার কাছে প্রস্তাব করেছেন। এরা সকলেই সম্মানীত লোক, এদের সকলের নামেই নামকরণ করা উচিৎ।

সিসিক মেয়র বলেন, বদরউদ্দিন আহমদ কামরান ভাইয়ের মৃত্যুর পরে আগামীকালই (মঙ্গলবার) আমাদের সাধারণ সভা ডাকা হয়েছে। এর আগে কোভিড-১৯ এর জন্য সিসিকের কোন সভা বা মিটিং অনুষ্ঠিত হয়নি। তাই আগামীকালের পরিষদের মিটিংয়ে আমি প্রস্তাবনাটি রাখবো, সেখান থেকে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তা আমি মন্ত্রণালয়ে পাঠাবো। আর সেখান থেকে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে সেটাই আমি বাস্তবায়ন করবো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন